অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সকল নিয়ম
অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া সহজ নিয়ম ও গাইডলাইন জানুন খুব সহজেই।
ঘরে বসে ই-রিটার্ন সাবমিট করার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, রেজিস্ট্রেশন এবং ট্যাক্স পেমেন্ট সহ ই-ট্যাক্স পোর্টালের খুঁটিনাটি সব নিয়ম সহজ ভাষায় ধাপে ধাপে আলোচনা করা হলো-
পেজ সূচিপত্র: অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সকল নিয়ম
- অনলাইনে আয়কর রিটার্ন কেন দেওয়া জরুরী
- প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হাতের কাছে রাখুন
- সঠিক পোর্টাল চেনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ
- সাইন আপ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করুন
- আয়ের বিবরণী সঠিকভাবে দিন
- কর রেয়াতের সুবিধা গ্রহণ করুন
- জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখ করুন
- আপনার মোট সম্পদের বিবরণী দিন
- অনলাইন ব্যাংকিংয়ে কর দিবেন যেভাবে
- ফাইনাল সাবমিশন সম্পন্ন করুন
অনলাইনে আয়কর রিটার্ন কেন দেওয়া জরুরী
বর্তমান ডিজিটাল যুগে করদাতাদের জন্য আয়করের হিসাব নিকাশ অনেক সহজ হয়ে গেছে। আগের মত এখন আর ট্যাক্স অফিসে গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার কোন প্রয়োজন পড়ে না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) এখন সম্পন্ন আধুনিক উপায়ে কর দাখিলের সুযোগ করে দিয়েছে। এখন আপনি নিজের ঘরে বসেই অত্যন্ত সুরক্ষিত ভাবে আপনার বার্ষিক আয় এর বিবরণী সরকারের কাছে পেশ করতে পারেন।
সচেতন নাগরিক হিসেবে দেশের উন্নয়নে অংশ নিতে এবং যেকোনো আইনি জটিলতা এড়াতে আমাদের নিয়মিত কর দেওয়া উচিত। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এই দায়িত্ব পালন করা আমাদের সকলের কর্তব্য। আপনি যদি ঘরে বসে কোন ঝামেলা ছাড়াই কর দিতে চান তবে অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া হবে আপনার জন্য সবচেয়ে সেরা এবং নিরাপদ একটি মাধ্যম।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হাতের কাছে রাখুন
ডিজিটাল পদ্ধতিতে ট্যাক্স ফাইল সাবমিট করার আগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টস আগে থেকে ঘুরতে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এতে ফ্রম পূরণের সময় কোন তাড়াহুড়া বা হলে সম্ভাবনা থাকবে না। প্রথমে আপনার ১২ ডিজিটের টিআইএন সার্টিফিকেট ও জাতীয় পরিচয় পত্র এন আই ডি কার্ডের কপিটি সাথে রাখুন। এই দুটো তথ্য আপনার প্রোফাইল ভেরিফিকেশন এর জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে।
চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের দেওয়া বেতন বিবরণী বা স্যালারি সার্টিফিকেট এবং সারা বছরের ব্যাংক স্টেটমেন্ট সংগ্রহ করতে হবে। ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে বার্ষিক লাভ ক্ষতির একটি আনুমানিক হিসাব তৈরি রাখতে হবে। আপনি যদি করার ছাড় বা রেয়াত পেতে চান তবে ডিপিএস সঞ্চয়পত্র বা জীবন বীমার রশিদ গুলো প্রস্তুত রাখুন। অনলাইনে আয়কর রিটার্ন প্রক্রিয়াটি দুইটা শেষ করতে এই কাজগুলো দারুণভাবে সাহায্য করবে।
আরও পড়ুনঃ Payoneer একাউন্ট কিভাবে খুলব
সঠিক পোর্টাল চেনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ
ইন্টারনেটে কাজ করার সময় সঠিক ও অফিশিয়াল ওয়েবসাইটটি চেনা অত্যন্ত জরুরী কারণ অনেক সময় ভুয়া বা ফিশিং সাইটের কারণে তথ্যের নিরাপত্তাই বিঘ্ন হতে পারে। বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এর অফিসিয়াল ই ট্যাক্স পোর্টালটি (etaxnbr.gov.bd) অত্যন্ত সুরক্ষিত ও ব্যবহার বান্ধব। এই একটি পোর্টাল থেকে করদাতার সমস্ত কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব।
আপনার ডিভাইসের যে কোনো ভালো ব্রাউজার যেমন গুগল ক্রোম ওপেন করে এই ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে হবে। সাইটের এন্টার ফেস খুবই পরিষ্কার এবং বাংলা ও ইংরেজী দুই ভাষাতে ব্যবহারযোগ্য। ডিজিটাল সিস্টেমে কর দেওয়ার মূল কাজগুলো এই পোর্টালের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়। তাই আয়কর রিটার্ন অনলাইনে জমা করার পূর্বে সাইটটির বিভিন্ন অপশন একটু ঘুরে দেখে নেওয়া ভালো।
সাইন আপ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করুন
পোর্টালে প্রবেশ করার পর প্রথম কাজ হলো নিজের নামে একটা অ্যাকাউন্ট তৈরি করা বা রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়াটি সফলভাবে শেষ করা। এর জন্য হোমপেজে থাকা রেজিস্ট্রেশন বাটনে ক্লিক করতে হবে। সেখানে আপনার বারো ডিজিটের ই টিআইএন নম্বরটি দিতে হবে। এরপর আপনার জাতীয় পরিচয় পত্র অনুযায়ী অন্যান্য সাধারণ তথ্য গুলো সঠিকভাবে নির্দিষ্ট ঘরে ইনপুট করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এখানে আপনার নিজের নামে নিবন্ধিত সিম কার্ডের মোবাইল নম্বরটি দিতে হবে। কারণ এই নম্বরে একাউন্ট ভেরিফিকেশনের জন্য ওটিপি পাঠানো হবে। ক্যাপচা করতে পূরণ করে সাবমিট করলে মোবাইলে একটি কোড আসবে। সেই কোডটি দিয়ে আপনার একাউন্টের জন্য একটি শক্তিশালী পাসওয়ার্ড সেট করে দিলে অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার জন্য অ্যাকাউন্ট প্রস্তুত হয়ে যাবে।
আয়ের বিবরণী সঠিকভাবে দিন
একাউন্টে লগইন করার পর রিটার্ন সাবমিশন অপশনে গেলে একটি ডিজিটাল ফর্ম ওপেন হবে। এই ফর্মের প্রথম অংশে আপনাকে আয়ের উৎস ও করবর্ষ সিলেক্ট করতে হবে। চাকরি, ব্যবসা, বাড়ি ভাড়া বা ব্যাংক আমানত আপনার আয়ের ক্ষেত বা হেড অফ ইনকাম কোনটি তা খুব সতর্কতার সাথে টিক চিহ্ন দিয়ে সিলেক্ট করতে হবে। ভুল তথ্য দিলে পরবর্তীতে ট্যাক্স হিসাবে সমস্যা হতে পারে।
আরও পড়ুনঃ সার্চ কনসোল কি
এরপর আপনার বার্ষিক মোট আয়ের পরিমাণটি নির্দিষ্ট বক্সে বসাতে হবে। বেতন বিবরণী বা ব্যাংক স্টেটমেন্ট দেখে নিখুঁত ভাবে টাকার অঙ্কটি টাইপ করা উচিত। সঠিক তথ্য দিলে সিস্টেম নিজে আপনার করযোগ্য আয় হিসাব করে নেবরং। আপনি যদি চান তবে এই অনলাইনে আয়কর দেওয়ার ডিজিটাল ফরমে ধাপে ধাপে তথ্য সেভ করে রাখতে পারেন।
কর রেয়াতের সুবিধা গ্রহণ করুন
বাংলাদেশ সরকারের ট্যাক্স আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট কিছু খেতে বিনিয়োগ করলে করদাতারা ট্যাক্স বা করের উপর বিশেষ ছাড় পেয়ে থাকেন যা আপনার ট্যাক্স এর পরিমাণ অনেক কমিয়ে দেয। যেমন আপনি যদি কোন স্বীকৃত ব্যাংকে ডিপিএস করেন সরকারি সঞ্চয়পত্র কেনেন কিংবা জীবন বীমার প্রিমিয়াম জমা দেন তবে সেই বিনিয়োগের তথ্য এখানে উল্লেখ করতে পারবেন।
এছাড়াও অনুমোদিত শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ বা কোন দাতব্য সংস্থা দান করে থাকলে তার রশিদ বা প্রমাণপত্র অনুযায়ী তথ্য এই রিবেড সেকশনে সাবমিট করতে হবে। এই সমস্ত তথ্য সঠিকভাবে ইনপুট করলে আপনার মোট প্রদেয় করের উপর সার পাওয়া যাবে। তাই অনলাইনে রিটার্ন জমা করার এই বিশেষ সুবিধাটি কোনভাবে মিস করা উচিত নয়।
জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখ করুন
আয়ের বিবরণের পাশাপাশি একজন করদাতার বার্ষিক জীবন যাত্রার ব্যয় বা লাইফস্টাইল এক্সপেনসেস ফরমে উল্লেখ করা একটি আইনি নিয়ম। সারা বছরে আপনার পারিবারিক খরচ,খাওয়া-দাওয়া, সন্তানদের পড়াশোনার খরচ, যাতায়াত এবং উৎসবের খরচ কত হয়েছে তার একটি বাস্তব সম্মত আনুমানিক হিসাব এখানে দিতে হবে।
যাদের মোট সম্পদ বা আয়ের পরিমাণ একটি নির্দিষ্ট সীমার ওপরে তাদের জন্য এই জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিবরণী দেওয়া বাধ্যতামূলক। তবে সাধারণ করদাতারাও এটি স্বেচ্ছায় পূরণ করতে পারেন। ব্যয়ের বিবরণীতে আপনার আয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত। অপ্রাসঙ্গিক তথ্য দিলে ফাইলটি অডিট বা পূর্ণ বিবেচনার আওতায় পড়তে পারে যা অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা বাড়াবে।
আপনার মোট সম্পদের বিবরণী দিন
আপনার স্থায়ী ও অস্থায়ী সমস্ত সম্পদের তথ্য সরকারকে জানানোর করদাতার একটি অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। একে (Assets and Liabilities) সেকশন বলা হয়। আপনার নামে কোন জমি, ফ্ল্যাট বা সোনা দানা থাকলে তার বিবরণ এবং ক্রয় মূল্য এখানে উল্লেখ করতে হবে। পাশাপাশি ব্যাংকে থাকা মোট জমানো টাকার পরিমানও দেখাতে হবে।
যদি আপনার কোন ব্যাংক লোন বা প্রাতিষ্ঠানিক দায় দেনা থাকে তবে সেই দায়ের তথ্য এই কলামে মাইনাস ফিগার হিসাবে বা দায় হিসেবে এন্ট্রি করার সুযোগ রয়েছে। সম্পদ ও দায়ের এই ব্যালেন্স শিট টি খুব সাবধানে মেলাতে হয়। একবার এটি নির্ভুল ভাবে করতে পারলে অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার কাজ প্রায় ৯০% সম্পন্ন হয়ে যায়।
অনলাইন ব্যাংকিংয়ে কর দিবেন যেভাবে
সব তথ্য পূরণ করার পর সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে হিসাব করে স্ক্রিনে দেখিয়ে দেবে যে আপনার কোন ট্যাক্স বা কর বকেয়া আছে কিনা। যদি কোন কর প্রদেয় থাকে তবে তা অনলাইনে দেওয়া যাবে। পোর্টালের সাথে যুক্ত রয়েছে পেমেন্ট গেটওয়ে, যার মাধ্যমে আপনি বিকাশ, রকেট বা নগদের মত মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ব্যবহার করে মুহূর্তেই ট্যাক্সের টাকা পরিশোধ করতে পারবেন।
এছাড়াও যে কোন ব্যাংকের ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড অথবা ইন্টারনেট ব্যাংকিং সুবিধা ব্যবহার করে এই সরকারি ফি বা করের টাকা সরাসরি চালানের মাধ্যমে জমা দেওয়া সম্ভব। টাকা জমা হওয়ার সাথে সাথে সিস্টেম থেকে একটি ইলেকট্রনিক চালান জেনারেট হবে করপরিষদের এ আধুনিক ব্যবস্থা অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রক্রিয়াটিকে আরো জনপ্রিয় করে তুলেছে।
আরও পড়ুনঃ ডলার রিসিভ করার নিয়ম
ফাইনাল সাবমিশন সম্পন্ন করুন
ট্যাক্স পেমেন্ট হয়ে গেলে বা আপনার যদি কোন প্রদেয় কর না থাকে তবে আপনি ফাইনাল সাবমিশনের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। সাবমিট করার আগে পুরো ফরমটির একটি প্রিভিউ বা খসড়া কপি স্ক্রিনে দেখা যাবে। প্রতিটি পাতায় দেওয়া তথ্য আয়ের অংক ও মোবাইল নম্বর শেষবারের মতো ভালো করে রিচেক করে নিন। সবকিছু শতভাগ ভুল মনে হলে সাবমিট রিটার্ন বাটনে ক্লিক করুন।
স্ক্রিনে একটি কনফারমেশন মেসেজ আসবে এবং আপনার অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রক্রিয়াটি সফলভাবে সম্পন্ন হবে। রিটার্ন সাবমিট হওয়ার সাথে সাথে পোর্টাল থেকে আপনার প্রাপ্তি স্বীকার পত্র এবং ট্যাক্স সার্টিফিকেট পিডিএফ ফরম্যাটে ডাউনলোড করে প্রিন্ট করে নিজের কাছে সংরক্ষণ করুন।
শেষ কথা: অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সকল নিয়ম
পরিশেষে বলা যায় যে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রক্রিয়াটি এখন আমাদের হাতের মুঠোই হয়। এটি কেবল সময় ও শ্রম সাশ্রয় করে না বরং কর প্রদানের পুরো ব্যবস্থাই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে। একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে সঠিক সময়ে সঠিক আয়ের তথ্য সরকারের কাছে পেশ করা আমাদের জাতীয় কর্তব্য।
সঠিক নিয়মে অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দিয়ে নিশ্চিত মনে থাকুন এবং দেশ গড়ায় অবদান রাখুন। ডিজিটাল এই যাত্রায় আপনি যত বেশি অভ্যস্ত হবেন আপনার নাগরিক জীবন তত সহজ সুন্দর হবে। কোন বিশেষ প্রয়োজনে আপনি পোর্টালে থাকা হেল্পলাইন গুলোর সহায়তা নিতে পারে।

লার্ন উইথ নুসরাতের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url