বাংলাদেশে ড্রপ শিপিং বিজনেস শুরু করার সম্পূর্ণ গাইড

বর্তমান ডিজিটাল যুগে তরুন প্রজন্মের কাছে বিনা পুঁজিতে ব্যবসা বা ঘরে বসে আয় করার অন্যতম জনপ্রিয় একটি মাধ্যমের নাম ড্রপ শিপিং বিজনেস। কোন পণ্য কেনা বা স্টক রাখার ঝামেলা ছাড়ায় বাংলাদেশের ড্রপ শিপিং বিজনেস শুরু করুন।

বাংলাদেশে-ড্রপ-শিপিং


ঘরে বসে খুব সহজে এই ব্যবসা শুরু করার গাইডলাইন ও সফল হওয়ার প্রফেশনাল টিপস গুলো জানতে এখনই পুরো আর্টিকেলটি পড়ুন।

পেজ সূচিপত্রঃ বাংলাদেশে ড্রপ শিপিং বিজনেস শুরু করার সম্পূর্ণ গাইড

বাংলাদেশে ড্রপ শিপিং ব্যবসা আসলে জিনিসটা কি?

বাংলাদেশের ড্রপ শিপিং হলো এমন এক ধরনের অনলাইন ব্যবসা যেখানে আপনার নিজের কোন দোকান বা পণ্য কিনে রাখার জন্য ঘর লাগবে না। আপনি অন্য কোন বড় কোম্পানির বা পাইকারি বিক্রেতার পণ্য নিজের ফেসবুক পেজ বা ওয়েবসাইটে সাজিয়ে রাখবেন। সহজ কথায় আপনি ক্রেতা ও মূল বিক্রেতার মাঝে একজন ডিজিটাল সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করবেন। পন্যর আকর্ষণীয় ছবি ভিডিও এবং সঠিক বিবরণ দিয়ে কাস্টমারদের আকৃষ্ট করাই হবে আপনার এই ব্যবসার প্রধান কৌশল।

ক্রেতা যখন আপনার কাছ থেকে পণ্যটি কিনতে চাইবে আপনি তার কাছ থেকে টাকা নিয়ে পাইকারি বিক্রেতাকে পণ্য দাম পাঠিয়ে দেবেন। এরপর সেই বিক্রেতা নিজ দায়িত্বে পণ্যটি ক্রেতার ঠিকানায় পৌঁছে দেবে।মাঝখান থেকে আপনি আপনার লাভটি রেখে দেবেন। 

বাংলাদেশে এই ব্যবসা কত প্রকার?

আমাদের দেশে সাধারণত দুইভাবে এই ড্রপ শিপিং ব্যবসা পরিচালনা করা সম্ভব। প্রথম ধরনটি হলো লোকাল ড্রপ শিপিং। এর মানে হল আপনি বাংলাদেশের ভেতরে কোন পাইকারি বিক্রেতা বা কোম্পানির পণ্য নিয়ে সব দেশের ভেতরে ক্রেতাদের কাছে অনলাইন পেজের মাধ্যমে বিক্রি করবেন।

এর দ্বিতীয় ধরনটি হলো গ্লোবাল বা আন্তর্জাতিক ড্রপ শিপিং। এ পদ্ধতিতে বাংলাদেশ থেকে ইন্টারনেট ব্যবহার করে শপিফাই বা অন্য কোন প্ল্যাটফর্ম এর মাধ্যমে আমেরিকা কানাডা বা ইউরোপের মতো উন্নত দেশের ক্রেতাদের কাছে পণ্য বিক্রি করা হয়।

যারা এই লাইনে একদম নতুন তাদের জন্য শুরুতে দেশের ভেতরে লোকাল রগ শিপিং দিয়ে ব্যবসা শুরু করাটাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ কারণ এতে ভাষা বা আন্তর্জাতিক পেমেন্ট নিয়ে কোন বাড়তি ঝামেলা পোহাতে হয় না এবং খুব সহজে কাস্টমার সামলানো যায়।

লাভজনক সঠিক পণ্য কিভাবে বাছবেন?

অনলাইন ব্যবসায়ী সফল হওয়ার প্রথম সত্যই হলো সঠিক পণ্য খুঁজে বের করা। সব ধরনের জিনিসপত্র একসাথে আপনার পেজে বিক্রি করতে গেলে ক্রেতারা বিভ্রান্ত হয়ে যাবে। এবং কোন পণ্য ঠিকমত বিক্রি হবে না। তাই শুরুতে যেকোনো একটি নির্দিষ্ট ক্যাটাগরি বেছে নিন। আমাদের দেশে বাজারে বর্তমানে বেশ কিছু পণ্যের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। যেমন- স্মার্ট ওয়াচ, হেডফোন, মেয়েদের স্ক্রিন কেয়ার ও কসমেটিক আইটেম অথবা ঘর সাজানোর আকর্ষণীয় লাইট।

 পণ্য বাছার সময় খেয়াল রাখবেন জিনিসটি যেন একটু আলাদা বা আনকমন হয়। যা সাধারণ বাজারে সহজে পাওয়া যায় না। একই সাথে পণ্যটির ওজন যেন কম হয় যাতে ডেলিভারি খরচ কম আসে এবং আপনার লাভের পরিমাণ বেশি থাকে।

ভালো পাইকারি বিক্রেতা কোথায় পাবেন?

আপনার এই বাংলাদেশের ড্রপ শিপিং ব্যবসার ভবিষ্যৎ কেমন হবে তা পুরোপুরি নির্ভর করবে আপনি কত ভালো ও সৎ পাইকারি বিক্রেতা বা সাপ্লায়ার খুঁজে পাচ্ছেন তার ওপর। কারণ পন্যের কোয়ালিটি এবং সঠিক সময়ে ডেলিভারি দেওয়ার পুরো দায়িত্ব কিন্তু এই সাপ্লায়ারের হাতেই থাকে।

দেশের মধ্যে লোকাল বিজনেস করার জন্য আপনি ঢাকা চকবাজার বা ইসলামপুরের বড় বড় হোলসেলারদের সাথে সরাসরি কথা বলে চুক্তি করতে পারেন। এছাড়া অনলাইনে বিডি ড্রপ শিপিং এর মত বেশ কিছু বাংলাদেশি ড্রপ শিপিং প্ল্যাটফর্ম রয়েছে, যারা নতুনদের পণ্য ও ডেলিভারি সেবা দিয়ে সাহায্য করে থাকে।

আর আপনি যদি বিদেশের বাজারে ব্যবসা করতে চান তবে চায়না বা আন্তর্জাতিক সাপ্লাইয়ারদের সাহায্য নিতে হবে। আন্তর্জাতিক ড্রপ শিপিং এর জন্য আলিএক্সপ্রেস শিপিং হলো বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং নির্ভরযোগ্য মাধ্যম।

ফ্রিতে অনলাইন দোকান কিভাবে খুলবেন?

পণ্য তো বাছাই করা হলো কিন্তু ক্রেতারা পণ্যগুলো দেখবে কোথায়? এর জন্য আপনার একটি সুন্দর অনলাইন দোকান বা শোরুম থাকতে হতে। প্রফেশনাল ওয়েবসাইট বানানোর মতো বড় বাজেট বা টাকা না থাকলে কোন সমস্যা নেই। সহজে এবং সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ব্যবসা শুরু করার জন্য আপনার ড্রপ শিপিং ব্র্যান্ডের একটি সুন্দর নাম ঠিক করুন। এরপর সেই নামে একটি ফেসবুক পেজ, ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইল এবং টিকটক একাউন্ট খুলে ফেলুন।
এগুলো খুলতে কোন টাকা লাগে না। পেজে সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য ক্যানভা অ্যাপ দিয়ে ফ্রিতে একটি চমৎকার লোগো এবং ব্যানার বানিয়ে সাজিয়ে নিন। পেজের বায়ো বা বিবরণীতে আপনার ব্যবসার মূল উদ্দেশ্যটি লিখে দিন। ব্যাস এভাবে কোন খরচ ছাড়াই আপনার চমৎকার অনলাইন দোকান তৈরি হয়ে যাবে।

ক্রেতার থেকে টাকা কিভাবে নেবেন?

বাংলাদেশের ড্রপ শিপিং ব্যবসা পরিচালনার জন্য পেমেন্ট বা টাকা লেনদেনের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের বাংলাদেশের মানুষ অনলাইনে কেনাকাটার ক্ষেত্রে পণ্য হাতে পেয়ে টাকা দেওয়া বা ক্যাশ অন ডেলিভারি পদ্ধতিটি সবচেয়ে বেশি পছন্দ বিশ্বাস করে। এই সুবিধা দেওয়ার জন্য আপনাকে দেশের যেকোন ভালো একটি কুরিয়ার সার্ভিসের সাথে একটি মার্চেন্ট একাউন্ট খুলতে হবে।

কুরিয়ারের প্রতিনিধিরাই ক্রেতার ঠিকানায় পণ্য পৌঁছে দিয়ে তার কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করবে। কোরিয়ার কোম্পানি ক্রেতার কাছ থেকে টাকা নেয়ার পর তাদের সার্ভিস চার্জ কেটে বাকি টাকা সরাসরি আপনার বিকাশ, নগদ ব্যাংক একাউন্টে পাঠিয়ে দেবে। আর অগ্রিম পেমেন্টের জন্য পেজে নিজস্ব বিকাশ বা নগদ পার্সোনাল নাম্বার যুক্ত রাখতে পারেন।

কাস্টমার পাওয়ার সেরা কৌশল গুলো কি ?

আপনার অনলাইন দোকানে শুধু ফোনের ছবি আর দাম লিখে রাখলেই কিন্তু ক্রেতারা নিজে থেকে চলে আসবে না। নতুন পেজে কাস্টমার নিয়ে আসার জন্য আপনাকে সঠিক উপায়ে এবং বুদ্ধি খাটিয়ে নিজের ব্র্যান্ডের প্রচার বা মার্কেটিং করতে হবে। সবচেয়ে দ্রুত কাস্টমার এবং অর্ডার পাওয়ার সেরা উপায় হল ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে টার্গেটেড অডিয়েন্সের কাছে অল্প টাকার পেইড বুস্টিং বা বিজ্ঞাপন দেওয়া।

এর মাধ্যমে খুব সহজেই আপনার পণ্যের আসল ক্রেতাদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব না।  তাছাড়া কোন টাকা খরচ না করে ফ্রিতে কাস্টমার পাওয়ার একটি চমৎকার বুদ্ধি হল টিকটক ফেসবুক ছোট ছোট সুন্দর রিভিউ বা  আনবক্সিং ভিডিও বানিয়ে আপলোড করা। আজকাল শর্ট ভিডিওর মাধ্যমে খুব দ্রুত লাখ  লাখ মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়।

ড্রপ শিপিং বিজনেসের মূল সুবিধা গুলো কি?

ড্রপসিপিং ব্যবসার সবচেয়ে বড় এবং আকর্ষণীয় সুবিধা হল এতে একদম না বললেই চলে এমন সামান্য পুঁজিতে নিজের একটি ব্যবসা শুরু করা যায়। প্রথাগত ই-কমার্স ব্যবসার মতো লাখ লাখ টাকার পণ্য আগে থেকে কিনে টাকা আটকে রাখার কোন ভয় এখানে নেই। আরেকটি বড় সুবিধা হল ব্যাংকিং বা ডেলিভারির ঝামেলা নেই। পণ্য কুরিয়ারে গিয়ে লাইন ধরে পাঠানো সুন্দর করে প্যাক করা এসব কোনো কাজই আপনাকে করতে হবে না।

এইসব ঝামেলার কাজ আপনার হয়ে পাইকারি বিক্রেতা বা সাপ্লায়ার একাই সামলে নেবে। সবশেষে এই ব্যবসাটি আপনাকে কাজের দারুন স্বাধীনতা দেয়। আপনার কাছে শুধু একটি স্মার্ট ফোন বা ল্যাপটপ এবং একটি ভাল ইন্টারনেট কানেকশন থাকলেই হবে। আপনি দেশের যে কোন প্রান্তে এমনকি নিজের ঘরে বসে পুরো ব্যবসা একা  নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন।

ড্রপ শিপিং ব্যবসার প্রধান অসুবিধা গুলো কি?

সব ব্যবসায়ী সুবিধার পাশাপাশি অসুবিধা ও খারাপ দিক থাকে। যা ড্রপ শিপিং শুরু করার আগে আপনার জেনে রাখা ভালো। এ ব্যবসার প্রধান অসুবিধা হলো পন্যের কোয়ালিটি বা গুণাগুণ এর উপর আপনার সরাসরি কোন হাত বা নিয়ন্ত্রণ থাকেনা। সাপ্লায়ার যদি ভুলবশত কোন কাস্টমারকে খারাপ ভাঙ্গা বা ভুল সাইজের পণ্য পাঠিয়ে দেয় তবে কাস্টমার কিন্তু সাপ্লায়ার কে চিনবে না সে আপনার পেজ বা ব্র্যান্ডকে দোষ দেবে।

এতে আপনার পেজের রিভিউ খারাপ হতে পারে এবং ব্যবসার ক্ষতি হতে পারে। এছাড়া মাঝে মাঝে কুরিয়ার সার্ভিসের দেরির কারণে বা সাপ্লায়ার এর স্টক শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে ক্রেতারা অসন্তুষ্ট হতে পারে। তবে শুরুতে একজন ভালো সৎ এবং রেসপন্সিভ সাপ্লায়ার খুঁজে নিতে পারলে এই সমস্যাগুলো খুব সহজে এড়িয়ে চলা সম্ভব।

ব্যবসায় সফল হতে যেসব বিষয় খেয়াল রাখবেন? 

 ড্রপ শিপিং ব্যবসায় দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে হলে এবং ভালো লাভ করতে হলে আপনাকে কাস্টমার সার্ভিসের উপর সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে। খুব দ্রুত এবং সব সময় মিষ্টি ভাষায় ও হাসিমুখে উত্তর দেয়ার চেষ্টা করুন। যদি কোন পণ্যে সমস্যা থাকে তবে সেটি সহজে ফেরত নেওয়া বা পরিবর্তন করে দেওয়ার একটি সহজ পলিসি রাখুন। এতে ক্রেতাদের মনে আপনার পেজের প্রতি গভীর আস্থা ও বিশ্বাস তৈরি হবে।

যা পরবর্তীতে আপনাকে আরো নতুন কাস্টমার পেতে সাহায্য করবে। সবশেষে একটি প্রফেশনাল টিপস হল যে কোন পণ্য নিজের পেজে আপলোড করার আগে নিজে কাস্টমার সেজে সেটি এক পিস অর্ডার করুন। এতে আপনি নিজেই পণ্যের আসল কোয়ালিটি এবং সাপ্লায়ার এর ডেলিভারি দিতে কতদিন সময় লাগছে তা নিজ চোখে যাচাই করে নিতে পারবেন।

শেষ কথাঃ বাংলাদেশের রব শিপিং বিজনেস শুরু করা সম্পূর্ণ গাইড

পরিশেষে বলা যায় যে বর্তমান ডিজিটাল যুগে নিজের ক্যারিয়ার গড়ার জন্য বাংলাদেশে ড্রপ শিপিং বিজনেস  অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত যে কোন ব্যবসা শুরু করতে হলে বড় অংকের পুজি ও নানারকম ঝামেলার মুখোমুখি হতে হয়। সেখানে ড্রপ শিপিং আপনাকে দিচ্ছে ঘরে বসে একদম স্বাধীন ভাবে নিজস্ব একটি ব্র্যান্ড গড়ে তোলার সুযোগ। এটি যেমন অল্প পুজিতে শুরু করা যায়, তেমনি সঠিক নিয়ম জানলে এখান থেকে প্রতি মাসে সম্মানজনক আয় করা সম্ভব।

তবে মনে রাখবেন যে কোন ব্যবসার মতোই এখানেও সফল হতে হলে আপনার প্রয়োজন হবে ধৈর্য সততা এবং সঠিক মার্কেটিং কৌশল। রাতারাতি বড়লোক হওয়ার ফাঁদে না পা দিয়ে এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি পেশা বা ব্যবসায়ী হিসেবে গ্রহণ করুন। সঠিক পরিকল্পনা আর পরিশ্রমের মাধ্যমে আজই শুরু করে দিন আপনার সফল ড্রপ শিপিং বিজনেসের এক নতুন পথচলা।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

লার্ন উইথ নুসরাতের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url